আপার প্রাইমারি টেট (Upper Primary TET)

 

 ভূমিকা: শিশুরা কিভাবে শেখে? - পিয়াজেটের দৃষ্টিকোণ। 




নমস্কার, সকল শিক্ষক পদপ্রার্থী বন্ধুদের। আপনারা যারা আপার প্রাইমারি টেট (Upper Primary TET) এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের জন্য চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পেডাগজি (CDP) অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 


এই অংশে শিশুদের শেখার প্রক্রিয়া এবং তাদের মানসিক বিকাশ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা অপরিহার্য। 


আজ আমরা শিশুদের জ্ঞানীয় বিকাশের একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করব – জ্যা পিয়াজেটের (Jean Piaget) জ্ঞানীয় বিকাশের তত্ত্ব (Cognitive Development Theory)।


পিয়াজেট ছিলেন একজন সুইস মনোবিজ্ঞানী, যিনি শিশুদের চিন্তাভাবনা এবং যুক্তি প্রদর্শনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিশদ গবেষণা করেছেন। তার মতে, শিশুরা শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষুদ্র সংস্করণ নয়, বরং তারা ভিন্নভাবে চিন্তা করে। তারা সক্রিয়ভাবে তাদের চারপাশের জগৎ সম্পর্কে জ্ঞান নির্মাণ করে। এই প্রক্রিয়াকে তিনি গঠনবাদ (Constructivism) বলেছেন।


জ্ঞানীয় বিকাশ কী?

জ্ঞানীয় বিকাশ বলতে বোঝায় একটি শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতাগুলির (যেমন: চিন্তা, যুক্তি, স্মৃতি, সমস্যা সমাধান, ভাষা) বৃদ্ধি ও পরিবর্তন। পিয়াজেট বিশ্বাস করতেন, এই বিকাশ একটি নির্দিষ্ট ধারাবাহিক পর্যায়ক্রম অনুসরণ করে ঘটে।

পিয়াজেটের তত্ত্বের মূল ধারণা (Core Concepts of Piaget's Theory)

পিয়াজেটের তত্ত্ব বোঝার জন্য কিছু মৌলিক ধারণা সম্পর্কে জানতে হবে:

 * স্কিমা (Schema): এটি হলো জ্ঞান বা তথ্যের মৌলিক একক। শিশুরা তাদের অভিজ্ঞতা থেকে যা শেখে, তা এই স্কিমার মাধ্যমে মানসিক কাঠামো তৈরি করে। যেমন: একটি শিশু যখন একটি কুকুর দেখে, তখন সে কুকুরের সম্পর্কে একটি স্কিমা তৈরি করে (চারটি পা, লোম, ডাকে)।

 * অভিযোজন (Adaptation): পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলার প্রক্রিয়া। এর দুটি অংশ:

   * আত্মীকরণ (Assimilation): নতুন তথ্যকে বিদ্যমান স্কিমার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা। যেমন: একটি শিশু যখন একটি নতুন প্রাণী (যেমন, বিড়াল) দেখে এবং সেটিকে কুকুর ভেবে 'ঘেউ ঘেউ' বলতে শুরু করে, কারণ তার কুকুরের স্কিমাতে চারটি পা, লোম, এবং আওয়াজ করার ধারণাটি রয়েছে।

   * সহযোজন (Accommodation): নতুন তথ্যের সাথে খাপ খাইয়ে চলার জন্য বিদ্যমান স্কিমাকে পরিবর্তন বা নতুন স্কিমা তৈরি করা। যেমন: যখন শিশুটি বুঝতে পারে যে বিড়ালটি কুকুর নয় (কারণ এটি 'মিউ মিউ' করে, 'ঘেউ ঘেউ' করে না), তখন সে বিড়ালের জন্য একটি নতুন স্কিমা তৈরি করে বা তার কুকুরের স্কিমাকে পরিবর্তন করে।

 * ভারসাম্য (Equilibration): আত্মীকরণ এবং সহযোজনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রক্রিয়া। এটি শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশে চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে। যখন শিশু কোনো নতুন তথ্যের কারণে জ্ঞানীয় ভারসাম্যহীনতা (Disequilibrium) অনুভব করে, তখন সে আত্মীকরণ বা সহযোজনের মাধ্যমে পুনরায় ভারসাম্য অর্জনের চেষ্টা করে।

পিয়াজেটের জ্ঞানীয় বিকাশের চারটি পর্যায় (Four Stages of Cognitive Development)

পিয়াজেট শিশুদের জ্ঞানীয় বিকাশকে চারটি নির্দিষ্ট পর্যায় বা স্তরে ভাগ করেছেন, যা একটি নির্দিষ্ট ক্রম অনুসরণ করে। কোনো শিশু এই পর্যায়গুলি এড়িয়ে যেতে পারে না, যদিও প্রতিটি পর্যায় অতিক্রম করার গতি ব্যক্তিগতভাবে ভিন্ন হতে পারে।

 * সংবেদন-সঞ্চালনমূলক পর্যায় (Sensorimotor Stage): জন্ম থেকে ২ বছর

   * বৈশিষ্ট্য: এই পর্যায়ে শিশুরা তাদের ইন্দ্রিয় (চোখ, কান, মুখ, নাক, ত্বক) এবং শারীরিক ক্রিয়াকলাপের (যেমন, চোষা, ধরা, তাকানো) মাধ্যমে জগৎকে বোঝে।

   * উপলব্ধি:

     * বস্তুর স্থায়িত্ব (Object Permanence): এই স্তরের শেষে শিশুরা বুঝতে পারে যে কোনো বস্তু তার চোখের আড়াল হলেও তার অস্তিত্ব বজায় থাকে (যেমন: একটি খেলনা চাদরের নিচে লুকিয়ে রাখলে শিশু জানে যে সেটি এখনো আছে)।

     * প্রতিক্রিয়া (Reflexes) থেকে উদ্দেশ্যমূলক আচরণ (Goal-directed behavior) বিকাশ লাভ করে।

     * সরল অনুকরণের ক্ষমতা দেখা যায়।

 * প্রাক-ধারণামূলক পর্যায় (Pre-operational Stage): ২ থেকে ৭ বছর

   * বৈশিষ্ট্য: এই পর্যায়ে শিশুরা প্রতীকী চিন্তাভাবনা (Symbolic thought) বা প্রতিনিধিত্বমূলক চিন্তা (representational thought) করতে শেখে। ভাষা এবং ছবি ব্যবহারের মাধ্যমে তারা বস্তুকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে।

   * সীমাবদ্ধতা:

     * অহং-কেন্দ্রিকতা (Egocentrism): শিশুরা অন্যের দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কিছু ভাবতে পারে না, কেবল নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকেই ভাবে।

     * সংরক্ষণ ধারণার অভাব (Lack of Conservation): তারা বস্তুর আকার বা বিন্যাস পরিবর্তন হলে তার পরিমাণ বা সংখ্যা একই থাকে, তা বুঝতে পারে না (যেমন: একই পরিমাণ জল লম্বা গ্লাসে ঢাললে তারা মনে করে জল বেড়ে গেছে)।

     * জীবন্তকরণ (Animism): শিশুরা জড় বস্তুতে জীবন আছে বলে মনে করে (যেমন: পুতুল বা পাথর কথা বলতে পারে)।

     * কেন্দ্রীভবন (Centration): তারা একটি বস্তুর একটি মাত্র দিকের উপর ফোকাস করে, অন্য দিকগুলো উপেক্ষা করে।

 * মূর্ত-সঞ্চালনমূলক পর্যায় (Concrete Operational Stage): ৭ থেকে ১১ বছর

   * বৈশিষ্ট্য: এই পর্যায়ে শিশুরা যুক্তিসঙ্গতভাবে চিন্তা করতে শুরু করে, তবে তা মূর্ত বস্তু বা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। তারা কংক্রিট সমস্যার সমাধান করতে পারে।

   * উপলব্ধি:

     * সংরক্ষণ ধারণা (Conservation): বস্তুর আকার বা বিন্যাস পরিবর্তন হলেও তার পরিমাণ বা সংখ্যা একই থাকে, তা বুঝতে পারে।

     * শ্রেণীকরণ (Classification): বস্তুকে বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী শ্রেণীবদ্ধ করতে পারে।

     * সারিভুক্তকরণ (Seriation): বস্তুকে তাদের আকার বা দৈর্ঘ্য অনুযায়ী সাজাতে পারে (ছোট থেকে বড়)।

     * বিকেন্দ্রীকরণ (Decentration): একটি বস্তুর একাধিক দিকের উপর মনোযোগ দিতে পারে।

     * ব্যতিক্রমী চিন্তা (Reversibility): কোনো কাজের বিপরীত ক্রিয়া বুঝতে পারে (যেমন: ২+৩=৫ হলে, ৫-৩=২ হয়)।

 * নিয়মতান্ত্রিক সক্রিয়তার পর্যায় (Formal Operational Stage): ১১ বছর থেকে প্রাপ্তবয়স্কতা

   * বৈশিষ্ট্য: এই পর্যায়ে শিশুরা বিমূর্তভাবে (Abstractly) এবং হাইপোথেটিকো-ডিডাক্টিভ (Hypothetico-deductive) যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে পারে। তারা বৈজ্ঞানিক উপায়ে সমস্যার সমাধান করতে পারে।

   * উপলব্ধি:

     * বিমূর্ত চিন্তাভাবনা: দৃশ্যমান নয় এমন ধারণা নিয়ে চিন্তা করতে পারে (যেমন, ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা)।

     * সৃজনশীল সমস্যা সমাধান: বিভিন্ন সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে ভাবতে এবং সেগুলোর ফলাফল অনুমান করতে পারে।

     * অনুমানমূলক চিন্তাভাবনা (Hypothetical Thinking): "যদি... তাহলে..." (If...then...) ধরনের পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে পারে।

পিয়াজেটের তত্ত্বের শিক্ষাগত তাৎপর্য (Educational Implications)

পিয়াজেটের তত্ত্ব শিক্ষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করতে সাহায্য করে:

 * শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষা (Child-Centered Education): পিয়াজেট শিক্ষাকে শিশুর সক্রিয় অংশগ্রহণের উপর জোর দিয়েছেন। শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়াকে সমর্থন ও উৎসাহিত করতে হবে।

 * উপযুক্ত পাঠ্যক্রম: শিশুদের বয়স ও জ্ঞানীয় বিকাশের পর্যায় অনুযায়ী পাঠ্যক্রম তৈরি করতে হবে।

 * অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক শিক্ষা: শিশুরা সক্রিয়ভাবে আবিষ্কার ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখে। তাই তাদের হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

 * সমস্যা সমাধান: শিশুদের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বিকাশে উৎসাহিত করতে হবে।

 * শিক্ষকের ভূমিকা: শিক্ষক একজন ফ্যাসিলিটেটর বা সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করবেন, যিনি শিক্ষার্থীদের নতুন ধারণা অনুসন্ধানে সাহায্য করবেন।

উপসংহার: আপার প্রাইমারি টেটের জন্য পিয়াজেট কেন জরুরি?

পিয়াজেটের জ্ঞানীয় বিকাশের তত্ত্ব CDP অংশের একটি অপরিহার্য বিষয়। আপার প্রাইমারি টেটে এই অংশ থেকে সরাসরি প্রশ্ন আসতে পারে। বিশেষ করে, প্রতিটি পর্যায় ও তার বৈশিষ্ট্য, মূল ধারণাগুলি (স্কিমা, আত্মীকরণ, সহযোজন) এবং শিক্ষাগত তাৎপর্য সম্পর্কে আপনার স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।

এই তত্ত্বটি আপনাকে শিশুদের শেখার প্রক্রিয়াকে গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করবে, যা আপনাকে একজন সফল এবং সহানুভূতিশীল শিক্ষক হতে সাহায্য করবে।

আপনার আপার প্রাইমারি টেট প্রস্তুতি সফল হোক! এই বিষয়ে

 আপনার আরও কোনো প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট করে জানাতে পারেন।

Post a Comment

Previous Post Next Post