কর্মশিক্ষা,(WORK EDUCATION)

                 কর্মশিক্ষা,(WORK EDUCATION)

                          সপ্তম শ্রেণীর জন্য 


১) কর্মশিক্ষা কাকে বলে?


কর্মশিক্ষা হল বিদ্যালয় পাঠক্রমের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেখানে হাতে-কলমে কাজ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দক্ষতা অর্জন করে। এটি একটি বহুমুখী শিক্ষণ প্রক্রিয়া, যা শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে যুক্ত বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ করে। কর্মশিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শুধু জ্ঞান অর্জন করে না, বরং সেই জ্ঞানকে বাস্তবে প্রয়োগ করতেও শেখে। এর মূল লক্ষ্য হল শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী করে তোলা এবং তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, সহযোগিতা, সৃজনশীলতা এবং আত্মনির্ভরশীলতার বিকাশ ঘটানো।

সহজভাবে বলতে গেলে, কর্মশিক্ষা হল কাজের মাধ্যমে শিক্ষা। এখানে বিভিন্ন ধরনের কাজ যেমন - বাগান করা, রান্না করা, সেলাই করা, কাঠ কাজ, ছবি আঁকা, মডেল তৈরি করা ইত্যাদি শেখানো হয়।

২) কর্মশিক্ষার উদ্দেশ্য লেখ?

কর্মশিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্যগুলি হল:

 * শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তা: হাতে-কলমে কাজ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং মনোযোগ ও একাগ্রতা বাড়ে।

 * দক্ষতা অর্জন: বিভিন্ন প্রকার কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নতুন নতুন দক্ষতা অর্জন করে, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য উপযোগী।

 * কাজের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি: কর্মশিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন পেশা ও কাজের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে পারে এবং তাদের মধ্যে কাজের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়।

 * সহযোগিতা ও দলবদ্ধভাবে কাজ করার মানসিকতা তৈরি: অনেক কর্মশিক্ষার কাজ দলবদ্ধভাবে করতে হয়, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও দলবদ্ধভাবে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তোলে।

 * সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা বৃদ্ধি: কর্মশিক্ষার বিভিন্ন কাজ শিক্ষার্থীদের নতুন কিছু তৈরি করতে উৎসাহিত করে, ফলে তাদের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা বাড়ে।

 * আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি: নিজেদের হাতে কাজ করার অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস ও আত্মনির্ভরশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে।

 * সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধি: বাস্তব সমস্যা সমাধানের জন্য কর্মশিক্ষার কাজ একটি চমৎকার সুযোগ তৈরি করে।

 * পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি: বাগান করা বা পরিবেশ রক্ষার সাথে যুক্ত কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা গড়ে ওঠে।

 * সময় ও সম্পদের সঠিক ব্যবহার শেখা: কর্মশিক্ষার কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হয়, যা শিক্ষার্থীদের সময়ানুবর্তিতা ও সম্পদের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা দেয়।

 * জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়: কর্মশিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার সুযোগ পায়।

৩) প্রকল্প কাকে বলে? প্রকল্প কত প্রকার ও কি কি?


প্রকল্প:

প্রকল্প হল একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিকল্পিত এবং ধারাবাহিক কাজের সমষ্টি। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়িত হয় এবং এর একটি সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য, কর্মপরিকল্পনা এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া থাকে। প্রকল্পে শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং নিজেদের জ্ঞান, দক্ষতা ও আগ্রহের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীরভাবে অনুসন্ধান করে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয় অথবা কোনো কিছু তৈরি করে।


প্রকল্পের প্রকারভেদ :

প্রকল্প বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। প্রধানত, কাজের প্রকৃতি, পরিধি এবং অংশগ্রহণের ধরনের উপর ভিত্তি করে প্রকল্পকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়। সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী কিছু সাধারণ প্রকারের প্রকল্প হল:

 * ব্যক্তিগত প্রকল্প (Individual Project): এই ধরনের প্রকল্পে একজন শিক্ষার্থী এককভাবে একটি নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করে। যেমন - একটি বিজ্ঞান মডেল তৈরি করা, একটি গল্প লেখা, একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদন তৈরি করা ইত্যাদি।

 * দলগত প্রকল্প (Group Project): এই ধরনের প্রকল্পে কয়েকজন শিক্ষার্থী একসাথে একটি নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করে। যেমন - বিদ্যালয়ের বাগানের পরিচর্যা করা, একটি নাটিকা মঞ্চস্থ করা, একটি সামাজিক সমস্যা নিয়ে সমীক্ষা করা ইত্যাদি।

 * নির্মিতিমূলক প্রকল্প (Construction Project): এই ধরনের প্রকল্পে শিক্ষার্থীরা কোনো কিছু তৈরি করে। যেমন - কাগজের মডেল তৈরি করা, মাটির জিনিস তৈরি করা, ফেলে দেওয়া জিনিস দিয়ে নতুন কিছু বানানো ইত্যাদি।

 * অনুসন্ধানমূলক প্রকল্প (Investigative Project): এই ধরনের প্রকল্পে শিক্ষার্থীরা কোনো একটি বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করে তথ্য সংগ্রহ করে এবং তার ভিত্তিতে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। যেমন - স্থানীয় ঐতিহাসিক স্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা, বিভিন্ন প্রকার পাখির খাদ্যাভ্যাস পর্যবেক্ষণ করা ইত্যাদি।

 * পরিবেশ সচেতনতামূলক প্রকল্প (Environmental Awareness Project): এই ধরনের প্রকল্পে শিক্ষার্থীরা পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে কাজ করে। যেমন - বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, প্লাস্টিক ব্যবহার কমানোর প্রচার ইত্যাদি।

 * সেবামূলক প্রকল্প (Service Project): এই ধরনের প্রকল্পে শিক্ষার্থীরা সমাজের বা বিদ্যালয়ের জন্য কোনো সেবামূলক কাজ করে। যেমন - বয়স্কদের সাহায্য করা, দরিদ্র শিশুদের জন্য শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ করা ইত্যাদি।


৪) কর্মশিক্ষায় কর্ম অভিজ্ঞতা কাকে বলে ?


কর্মশিক্ষায় কর্ম অভিজ্ঞতা বলতে বোঝায় বিদ্যালয়ে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাতে-কলমে কাজ করার মাধ্যমে অর্জিত বাস্তব জ্ঞান ও দক্ষতা। এটি শুধুমাত্র তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনের বাইরে গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতিতে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রকার কাজের সাথে পরিচিত হয় এবং সেই কাজগুলি করার প্রাথমিক ধারণা ও দক্ষতা লাভ করে।


সহজ ভাষায়, কর্ম অভিজ্ঞতা হলো বিদ্যালয়ে বিভিন্ন উৎপাদনমুখী বা পরিষেবা মূলক কাজের সাথে সরাসরি যুক্ত হওয়া এবং সেই কাজের মাধ্যমে শেখা।

কর্ম অভিজ্ঞতার কিছু উদাহরণ:

 

* বিদ্যালয়ের বাগান তৈরি ও পরিচর্যা করা।

 * কাগজের ঠোঙা বা অন্যান্য ব্যবহারিক জিনিস তৈরি করা।

 * রান্নার কাজে সাহায্য করা।

 * বই বাঁধাই করা।

 * বিদ্যুৎ সংযোগ বা অন্যান্য কারিগরি কাজ দেখা ও শেখা।

 * বিদ্যালয়ের পরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা।

 * স্থানীয় কারিগরের কাছে গিয়ে তাদের কাজ পর্যবেক্ষণ করা।

কর্মশিক্ষার এই অংশটি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে সাহায্য করে।



কর্মশিক্ষায় সামাজিক প্রকল্প কাকে বলে?

 

 একটি কাজ যা শিক্ষার্থীদের দলবদ্ধভাবে সমাজের কোনো সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধানের জন্য পরিকল্পনা করতে, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে এবং সবশেষে তাদের কাজের মূল্যায়ন করতে শেখায়। এই ধরনের প্রকল্পগুলি সাধারণত বিদ্যালয়ের গতানুগতিক শ্রেণীকক্ষের বাইরে সম্পন্ন হয় এবং এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে ধারণা লাভ করে এবং সেই সমস্যা মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করে।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কর্মশিক্ষার অধীনে সামাজিক প্রকল্প হল একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা, যেখানে শিক্ষার্থীরা সমাজের কল্যাণে কোনো নির্দিষ্ট কাজ হাতে নেয় এবং সেটি সফলভাবে সম্পন্ন করে।

সামাজিক প্রকল্পের কিছু উদাহরণ:

 * বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পরিষ্কার রাখা এবং বৃক্ষরোপণ করা।

 * স্থানীয় বস্তি বা পিছিয়ে পড়া এলাকায় স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি বা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো।

 * রাস্তার ধারে বসবাসকারী দুঃস্থ মানুষদের শীতবস্ত্র বিতরণ করা।

 * পুরোনো বই বা পোশাক সংগ্রহ করে অভাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা।

 * পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য র‍্যালি বা আলোচনা সভার আয়োজন করা।

 * বিদ্যালয়ের আশেপাশে বয়স্ক বা অসুস্থ মানুষদের সাহায্য করা।

এই ধরনের প্রকল্পগুলি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযোগিতা, সহমর্মিতা, নেতৃত্ব, পরিকল্পনা ও সমস্যা সমাধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দক্ষতা বিকাশে সহায়ক ভূমিকা 

পালন করে।



সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র ছাত্রীদের জন্য প্রজেক্ট খাতার নমুনা



সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র ছাত্রীদের জন্য একটি সাধারণ প্রজেক্ট খাতার কাঠামো নিচে দেওয়া হল। এই কাঠামো অনুসরণ করে শিক্ষার্থীরা তাদের কর্মশিক্ষা প্রকল্পের কাজ সুন্দরভাবে নথিভুক্ত করতে পারবে:

প্রকল্প খাতা


ছাত্র/ছাত্রীর নাম:

শ্রেণী:

বিভাগ:

বিদ্যালয়ের নাম:

প্রকল্পের বিষয়: (এখানে শিক্ষার্থীরা তাদের নির্বাচিত প্রকল্পের নামটি লিখবে)

শিক্ষকের নাম: (যে শিক্ষক প্রকল্পটি তত্ত্বাবধান করছেন)

জমা দেওয়ার তারিখ:




Post a Comment

Previous Post Next Post